ড. মোমতাজ উদ্দিন আহাম্মদ
সভাপতি, ভাষা আন্দোলন স্মৃতিরক্ষা পরিষদ :
“একুশে ফেব্রুয়ারি”এই বাক্যটি আমাদেরকে একটি আবেগঘন রক্তাক্ত ঘটনার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যে এদেশের ছাত্র-জনতা মায়ের ভাষায় কথা বলার অধিকারের দাবীতে রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছিল।আমরা কতজন জানি যে এই সংগ্রাম কি করে শুরু হয়েছিল এবং পুরানো ঢাকার লোকজন এই সংগ্রামে ঠিক কতটা জড়িত ছিল।ভাষা আন্দোলনের কথা উঠলে অধিকাংশ মানুষই মনে করে বুঝি ‘৫২ এর ফেব্রুয়ারিতেই এটা ঘটেছিল।আসলে সব আরম্ভেরই একটা আরম্ভ থাকে,অগ্নিকান্ড ঘটার আগে ছোট কোন স্ফুলিঙ্গ থেকেই তার শুরুটা ঘটে।ভারতবর্ষে প্রায় পৌনে দু’শ বছর ব্রিটিশের ভেদনীতির শাসনে মুসলমানরা শিক্ষা তথা জীবন ও জীবিকার ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু সম্প্রদায় হতে পিছিয়ে পরে।২য় বিশ্বযুদ্ধের পর অবধারিতভাবে হিন্দু এবং মুসলমানদের জন্য আলাদা রাজ্য সৃষ্টির প্রয়োজন হয়ে পরে। এরই পেক্ষাপটে ১৯৪০ সনে লাহোরে শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক একাধিক রাজ্য নিয়ে ফেডারেল রাষ্ট্রপুঞ্জের প্রস্তাব তুলেছিলেন,কিন্তু পাকিস্তান সৃষ্টির কালে এই প্রস্তাব উপেক্ষিত হলে বাংলার শীর্ষস্থানীয় রাজনীতিবীদরা পাকিস্তানে না এসে কলিকাতায় অবস্থান করতে লাগলেন এই ফাঁকে নতুন পাকিস্তানে পশ্চিমারা শাসন ও প্রশাসন যন্ত্রে জেঁকে বসলেন,এভাবেই শুরু হলো পূর্ব বাঙলার জনগনের বঞ্চনার ইতিহাস।সরকারী দপ্তর,শিক্ষাক্ষেত্র, পোষ্টকার্ড ও ডাকটিকেট সহ সর্বত্র বাংলা উপেক্ষিত হতে থাকলো।উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার সিদ্ধান্ত নেয়ায় সচেতন মহলে আসন্তুষ্টির স্ফুলিঙ্গ জ্বলতে শুরু করে।এরই পটভূমিকায় আজিমপুর নিবাসী আবুল কাসেম ১৯৪৭ সালের ১লা সেপ্টেম্বার ঢাকায় পাকিস্তান তমুদ্দুন মজলিস গঠন করেন এবং এর মাধ্যমে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রকাশ্য দাবী জানানো হয়।আন্দোলন সংঘঠিত হতে থাকে কিন্তু জনতা তখনও দ্বিধাদন্দ্বে ছিল।অধ্যক্ষ আবুল কাশেম পুরানো ঢাকার মানুষদের মনে দ্বিধাদন্দ্বের অবসান ঘটিয়ে তাদেরকে আন্দোলনে সম্পৃক্ত করার জন্য ‘ঢাকা মজলিশ’ নামে একটি সংগঠন আব্দুল মান্নানের(পরে নবকুমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক) দায়িত্বে গঠন করে ঢাকাইয়াদের আন্দোলনমূখি করে তোলেন এবং মোগলটুলির ‘ওয়ার্কাস ক্যাম্প’ এর শেখ মজিবুর রহমানের সহকর্মী ঢাকার শাওকাত আলীর সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন।আন্যদিকে ঢাকার বাড়ি বাড়িতে লজিং মাষ্টার সাহেবরা তাদের ছাত্রছাত্রী এবং এদের অভিভাবকদেরকে আন্দোলনের প্রতি সহানুভূতিশীল করে তুলতে থাকেন।তার পরিপেক্ষিতে ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ধর্মঘট ও ১৬ মার্চ পর্যন্ত চলমান বিক্ষোভে এই ছাত্র-জনতা প্রকাশ্যে অপ্রকাশ্যে সামিল হয়।তৎকালীন ইন্টারমিডিয়েট কলেজের ছাত্র লালবাগের আবুল খায়ের মাহমুদ আমাকে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানান তিনি আন্দোলনের শুরু হতে বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবীর লিফলেট বিতরণে সক্রিয় ছিলেন এবং একটা পর্যায়ে পুলিশের দ্বারা গ্রেফতারও হন তিনি ঐতিহাসিক ১১মার্চে সচিবালয়ের নিকট পিকেটিং কালে হাতে আঘাতপ্রাপ্ত হন, তার মতো স্থানীয় ছাত্রদের অনেকেই আন্দোলনে সামিল ছিলেন কিন্তু তাদের কথা ইতিহাসে চাপা পরে গেছে।খাজা দেওয়ান মহল্লায় এম এল এ আনোয়ারা খাতুনের বাসাটিও ছিল সকল রাজনৈতিক নেতাদের মিলনস্থল, ঢাকার মেয়ে হওয়াতে সর্দাররা এবং স্থানীয় তরুনরা তার প্রতি সহানুভূতিশীল ছিল।ভাষাসৈনিক অলি আহাদ জানান যে ১১মার্চের ধর্মঘট সংঘঠনে আনোয়ারা খাতুনের সবচেয়ে বেশি অবদান ছিল।১৫০ মোগলটুলির শওকত আলী ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ট সহচর ১১ মার্চের ধর্মঘটের দিন বঙ্গবন্ধু সাথে তিনিও গ্রেফতার হয়ে কারা বরন করেন।১৫ মার্চ ঐতিহাসিক ‘রাষ্ট্রভাষা চুক্তি’র পরে তিনিও সকলের সাথে মুক্ত হন আবার ১৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে এসেম্বেলি ঘেরাও করতে গিয়ে পুলিশের হামলায় গুরুতর আহত হন।গবেষনায় অনেক অজানা গল্প বেড়িয়ে আসতে পারে।রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন তথা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে ১১ মার্চের ‘রাষ্ট্রভাষা দিবস’এর প্রথম ধর্মঘট এবং ১৫ মার্চের ‘রাষ্ট্রভাষা চুক্তি দিবস’ এর বিক্ষুব্ধ দিনগুলি ইতিহাসে ক্রান্তিকাল হিসেবে বিবেচিত হবে যে কারনে এই চুক্তিভঙ্গের পরিনামেই ২১শে ফেব্রুয়ারির রক্তাক্ত অধ্যায় রচিত হয়েছিল এবং একই সাথে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে পুরানো ঢাকার জনগনের অবদান শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হবে।
মন্তব্য করুন