১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার বোঝা বাংলাদেশে, অপেক্ষার শেষ কোথায়—ব্যর্থতার দায় কার?
প্রত্যাবাসন আটকে, দীর্ঘ হচ্ছে সংকট; বাড়ছে মানবিক ও নিরাপত্তা চাপ।
ইসমাইল আহমেদ
২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা সংকট প্রায় এক দশকে গড়িয়েছে। কিন্তু এখনো বড় পরিসরে শুরু হয়নি প্রত্যাবাসন। ফলে একদিকে বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি মানবিক চাপ, অন্যদিকে ক্যাম্পের নিরাপত্তা ও সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে।
ইউএনএইচসিআরের ৩০ জুন ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ ১৭১ জনের বেশি। এর মধ্যে কক্সবাজারের ৩৩টি ক্যাম্পে প্রায় ১১ লাখ ৬৬ হাজার ৩৫২ জন এবং ভাসানচরে আনুমানিক ৩৩ হাজার ৮১৯ জন রয়েছেন।
*প্রত্যাবাসনে বড় বাধা রাখাইনের সংঘাত*
বাংলাদেশের দেওয়া ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জনের তালিকা থেকে মিয়ানমার প্রায় ৩ লাখ ৯ হাজার জনকে যাচাই করেছে। তবে পরিচয় যাচাইয়ের পাশাপাশি নিরাপত্তা, নাগরিক অধিকার ও নিজ এলাকায় ফেরার নিশ্চয়তা না থাকায় প্রত্যাবাসন এগোচ্ছে ধীরগতিতে।
রাখাইন রাজ্যে চলমান সংঘাতই বর্তমানে প্রত্যাবাসনের অন্যতম বড় প্রতিবন্ধকতা বলে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর বক্তব্যে উঠে এসেছে। যদিও আগেও তারা রোহিঙ্গাদের ফেরানো নিয়ে টালবাহানা করেই আসছে।
–ক্যাম্পে নিরাপত্তা উদ্বেগ–
২০২৬ সালের জানুয়ারি-মার্চ ৩ মাস সময়ে, কক্সবাজারের ক্যাম্প ও ভাসানচরে ৪৫৫টি গুরুতর নিরাপত্তা ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এতে ৮৩২ জন আক্রান্ত হয়েছেন। সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র, মাদক ও মানবপাচারসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঝুঁকি পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলছে।
চাপ শুধু ক্যাম্পে নয়
দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক মানুষকে আশ্রয় দেওয়ায় কক্সবাজারের পরিবেশ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অবকাঠামোর ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক অর্থায়নের ঘাটতি হলে খাদ্য, স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা কার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০২৬ সালের মানবিক সহায়তা পরিকল্পনায় রোহিঙ্গা ও স্থানীয় আশ্রয়দাতা জনগোষ্ঠীর জন্য প্রায় ৭১১ মিলিয়ন ডলার প্রয়োজন ধরা হয়েছে।
“স্থায়ী সমাধান কোথায়”?
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হিসেবে নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের ওপরই জোর দিচ্ছে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
এর জন্য রাখাইনে নিরাপদ পরিবেশ, রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক তদারকি প্রয়োজন। প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত ক্যাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখাও জরুরি।
এখন প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে—১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গার ভবিষ্যৎ কোথায়? উত্তরটি নির্ভর করছে মিয়ানমারের পরিস্থিতি ও তাদের আগ্রহ, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসনের বাস্তব অগ্রগতির ওপর।
বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান হলো—রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো বিকল্প নেই। দীর্ঘমেয়াদে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে অবস্থান টেকসই নয়। তাই মিয়ানমারে তাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য বাংলাদেশ কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কার্যকর সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে।আর ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য অনুযায়ী সরকার, রোহিঙ্গা ইস্যুটি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সক্রিয়ভাবে ধরে রাখার ওপরও জোর দিচ্ছে।
মন্তব্য করুন