
প্রতিবেদক ও তথ্য সংগ্রহ: ইসমাইল আহমদ
সমাজে বহুল প্রচলিত একটি ধারণা হলো, নিকাহ সম্পন্ন হওয়ার জন্য বর বা কনেকে অবশ্যই “আমি কবুল করলাম” বলতে হবে। কিন্তু হানাফি ফিকহের নির্ভরযোগ্য গ্রন্থসমূহ পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বিষয়টি কেবল একটি নির্দিষ্ট শব্দের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং নিকাহের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো ইজাব (বিয়ের প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ)—অর্থাৎ উভয় পক্ষের সুস্পষ্ট ও শরিয়তসম্মত সম্মতি।
ফকিহগণের মতে, যদি এমন কোনো শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করা হয়, যা স্পষ্টভাবে বিয়ের প্রস্তাব গ্রহণ এবং বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অর্থ প্রকাশ করে, তাহলে নিকাহ সহিহ হতে পারে।
নিকাহ সহিহ হওয়ার মৌলিক শর্ত
হানাফি ফিকহ অনুযায়ী নিকাহ বৈধ হওয়ার জন্য সাধারণভাবে নিম্নোক্ত শর্তগুলো পূরণ হওয়া প্রয়োজন:
এক পক্ষের পক্ষ থেকে স্পষ্ট ইজাব (বিয়ের প্রস্তাব) থাকতে হবে।
অপর পক্ষের পক্ষ থেকে সেই প্রস্তাব গ্রহণ (কবুল) থাকতে হবে।
ইজাব ও কবুল একই বৈঠকে (মজলিসে) সম্পন্ন হতে হবে।
দুইজন মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক ও ন্যায়পরায়ণ পুরুষ সাক্ষী অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী উপস্থিত থাকতে হবে।
বিবাহে কোনো শরয়ি প্রতিবন্ধকতা থাকা যাবে না।
‘কবুল’ বলা ছাড়াও যেসব শব্দে নিকাহ/বিবাহ সহিহ হতে পারে,
হানাফি ফিকহের গ্রন্থসমূহে উল্লেখিত কিছু উদাহরণ—
قَبِلْتُ (ক্ববিলতু) — আমি গ্রহণ করলাম।
رَضِيتُ (রদ্বিতু) — আমি রাজি হলাম / আমি সন্তুষ্ট হলাম।
تَزَوَّجْتُ
(তাযাওয়াজ্জতু) — আমি বিবাহ করলাম।
أَنْكَحْتُ نَفْسِي আমি নিজেকে বিবাহ দিলাম।
প্রয়োজন অনুযায়ী এমন আরো অন্যান্য স্পষ্ট শব্দ, যা বর্তমান সময়েই বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অর্থ প্রকাশ করে।
ফিকহি গ্রন্থের বক্তব্য
১. আল-হিদায়া (الهداية)
ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.) বলেন—
وينعقد النكاح بلفظ النكاح والتزويج وما في معناهما
অর্থাৎ, নিকাহ “নিকাহ”, “তাযউইজ (বিবাহ)” এবং এগুলোর সমার্থবোধক শব্দের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
২. ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া (الفتاوى الهندية)
এ গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে যে, নিকাহ এমন সুস্পষ্ট শব্দের মাধ্যমেও সম্পন্ন হতে পারে, যা বিবাহের অর্থ প্রকাশ করে। যেমন—
أنكحت، تزوجت، قبلت، رضيت
অর্থাৎ—“আমি বিবাহ দিলাম”, “আমি বিবাহ করলাম”, “আমি গ্রহণ করলাম”, “আমি রাজি হলাম”।
৩. রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার (رد المحتار على الدر المختار)
ইবনু আবিদিন (রহ.) উল্লেখ করেন—
নিকাহ এমন প্রত্যেকটি সুস্পষ্ট শব্দ দ্বারা সহিহ হয়, যা তাৎক্ষণিকভাবে বৈবাহিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার অর্থ প্রকাশ করে।
কোরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“অতঃপর হয় তাদেরকে বিধি অনুযায়ী রেখে দাও, অথবা সুন্দরভাবে বিদায় দাও।”
— সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২২৯
এ আয়াতে বৈবাহিক সম্পর্কের মর্যাদা ও দায়িত্বশীলতার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সম্মতির গুরুত্ব
রাসুলুল্লাহ ﷺ নারীর সম্মতির গুরুত্ব সম্পর্কে বলেছেন—
“বিধবা নারীর বিষয়ে তার নির্দেশ গ্রহণ করা হবে এবং কুমারী নারীর কাছে তার অনুমতি চাওয়া হবে।”
(সহিহ আল-বুখারি, হাদিস: ৫১৩৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ১৪১৯)
এ থেকে বোঝা যায়, নিকাহে উভয় পক্ষের সম্মতি অপরিহার্য।
আলেমদের পরামর্শ
ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শরিয়তে বিকল্প শব্দের সুযোগ থাকলেও বাস্তবে বিভ্রান্তি, মতভেদ ও আইনি জটিলতা এড়াতে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী কাজি বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের নির্দেশনা অনুসরণ করে সাহ্মির উপস্থিতে “আমি কবুল করলাম” বলেই নিকাহ সম্পন্ন করা অধিক নিরাপদ ও উত্তম।
তাঁদের মতে, নিকাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ শরয়ি চুক্তি। তাই শব্দের বিতর্কে না গিয়ে নিকাহের সব শর্ত পূরণ, দেনমোহর নির্ধারণ, সাক্ষীর উপস্থিতি এবং সরকারি নিবন্ধনের প্রতিও সমান গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তথ্যসূত্র
১. আল-হিদায়া, ইমাম আল-মারগীনানী, কিতাবুন নিকাহ।
২. আল-ফাতাওয়া আল-হিন্দিয়্যা (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া), কিতাবুন নিকাহ।
৩. রদ্দুল মুহতার আলা আদ-দুররিল মুখতার, ইবনু আবিদিন, কিতাবুন নিকাহ।
৪. বাদায়িউস সানায়ি, আল-কাসানি, কিতাবুন নিকাহ।
৫. সহিহ আল-বুখারি, হাদিস নং ৫১৩৬।
৬. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৪১৯।
৭. পবিত্র কোরআন, সূরা আল-বাকারা, আয়াত ২২৯।
মন্তব্য করুন